
বিগত চার দশকের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের সাক্ষী হলো বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। টানা অতি ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে নগরীর সড়ক যোগাযোগ। সড়ক-নালার পার্থক্য করা যাচ্ছে না। তিন-চার গুণ ভাড়া দাবি করায় চলার পথে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছেন ঘরমুখী মানুষ।
সরেজমিনে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে গেছে। গণপরিবহনের সংখ্যা কম। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও কিছু ভাড়ায়চালিত যানবাহন দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছে। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বাহন পেয়েছে।
এমনটাই অভিযোগ যাত্রীদের। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে নগরের সিটি গেট, আগ্রাবাদ, বাদামতলী, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। সড়ক-ড্রেন সব একাকার হয়ে গেছে কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় ছোট যানবাহনের চলাচল একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়।
অনেক মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি পানিতে বিকল হয়ে সড়কের মাঝেই আটকা পড়ে। কোনটি ড্রেন-নালা কোনটি সড়ক বুঝতে পারছিলেন না কেউ। নিচু ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকতে দেখা গেছে। অনেক ব্যবসায়ীর পণ্যও নষ্ট হয়েছে।
ঘরে পানি ঢোকায় বিপাকে পড়েছেন অনেক বাসিন্দা। সরেজমিনে নগরের কয়েকটি বাসস্টপে দেখা যায়, অফিসফেরত মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত যানবাহন পাচ্ছেন না। এ সুযোগে অনেক চালক গন্তব্যভেদে স্বাভাবিক ভাড়ার দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত ভাড়া দাবি করছেন। অতিরিক্ত ভাড়া দিতে রাজি না হলে অনেক চালক যাত্রী তুলতেও অনীহা প্রকাশ করেন।
চকবাজার থেকে আগ্রাবাদগামী সরকারি কর্মকর্তা রণি পাল জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিদিন যে পথে ৩০০ টাকায় যাওয়া যায়, মঙ্গলবার সকালে একই পথে যেতে ৮০০ টাকা ভাড়া চাওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ায় যেতে হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি বহদ্দারহাট এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আসমা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, সন্তানের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা থাকায় যে কোনোভাবেই সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে। রিকশা না পেয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করতে হয়।
স্বাভাবিকের প্রায় তিনগুণ ভাড়া দিতে হয়েছে। আগ্রাবাদ অ্যাক্সেস রোড, বাদামতলী, মোহরা, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও নালার পার্থক্য বোঝা যাচ্ছিল না। পানি জমে থাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করে এবং অনেক এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। যা বলছে আবহাওয়া অফিস বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ বশির আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, গতকাল বিকেল ৩টা থেকে আজ বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
আর গতকাল সন্ধ্যা থেকে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৩৯৪ দশমিক ৩ মিলিমিটার।’ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, এই বৃষ্টিপাত গত ৪২ বছরের মধ্যে রেকর্ড। এর আগে ১৯৮৩ সালে ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে।
হাঁটুপানিতে তিনগুণ ভাড়া হাঁকছেন চালকরা, যাত্রীদের ভোগান্তি পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। সড়কে সেনাবাহিনী এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কাজ করছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
পাহাড়ধসের ঝুঁকি, সজাগ সিটি করপোরেশন টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন। প্রস্তুত রাখা হয়েছে একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র। সড়কে কাজ করছে সেনাবাহিনীচট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মঙ্গলবার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শন করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না থাকার অনুরোধ জানান তিনি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা অভিষেক দাশ জাগো নিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর আনুমানিক ৯-১০টি ওয়ার্ড জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে। আনুমানিক ৫-৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি।
সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর রেসকিউ টিম মাঠে আছে। তারা বিভিন্ন জায়গা, প্লাবিত অঞ্চল পরিদর্শন করে জলাবদ্ধতা নিরসন ও জনদুর্ভোগ নিরসনে কাজ করছেন। রাতে আমি নগরীর নিম্নাঞ্চল পরিদর্শন করবো। সড়কে কাজ করছে সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় নগরের আটটি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সই করা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার এক নির্দেশনায় এ তথ্য জানানো হয়। এমআরএএইচ/এএসএ