বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ
বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ
Friday, 17 Jul 2026 02:01 am
বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ

বিডি জাগরণ । প্রতিবাদের প্রথম কন্ঠ

ইউক্রেন যুদ্ধ এক নতুন মোড় নিয়েছে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ক্রমান্বয়ে শিথিল হয়ে পড়ছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি ছিল রাশিয়ার সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। তবে সম্প্রতি পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতায় এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে এই উপদ্বীপটি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল নিয়েছে ইউক্রেন। এই পরিকল্পনা সফল হলে যে কোনো ধরনের ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনায় ইউক্রেন সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। আরও পড়ুন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে ভয় ছড়াচ্ছে ইউক্রেনের ‘কিলার রোবট’ ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের সর্বাত্মক হামলা সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি এবং দ্য ইকোনমিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনীয় হামলার পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২২ সাল থেকে এই পর্যন্ত উপদ্বীপটিতে মোট ৬৯২টি বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি হামলা হয়েছে গত ১২ মাসে। এমনকি মোট হামলার এক-পঞ্চমাংশ চালানো হয়েছে চলতি বছরের জুন মাসের পর থেকে। ইউক্রেন মূলত ক্রিমিয়ার কৌশলগত অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, গুরুত্বপূর্ণ সেতু, তেলের ডিপো এবং সামরিক বিমানঘাঁটি। একই সাথে ড্রোন হামলার মাধ্যমে ক্রিমিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সংযোগকারী সড়ক, রেলপথ এবং জলপথ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ক্রিমিয়ায় রুশ বিমানঘাঁটিতে বিস্ফোরণ/ ছবি: তাস অচল কের্চ সেতু ও অবরুদ্ধ জলপথ রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সাথে ক্রিমিয়াকে যুক্ত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো কের্চ সেতু। ইউক্রেনের ক্রমাগত হামলার কারণে এই সেতুটি এখন রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে এই সেতু দিয়ে জ্বালানি তেলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মালামাল পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সব ধরনের ভারী ট্রাক চলাচলও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আরও পড়ুন রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত জলপথেও রাশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সেভাস্তোপল বন্দরে অবস্থানরত রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহর ইউক্রেনীয় হামলার মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।

রুশ নৌবাহিনী তাদের জাহাজগুলো দূরবর্তী নিরাপদ বন্দরে সরিয়ে নিয়েছে। গত ১৩ জুলাই রাশিয়া আজভ সাগর দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল স্থগিত করতে বাধ্য হয়। এই জলপথটি রাশিয়ার মোট খাদ্যশস্য রপ্তানির এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এর পরদিনই ইউক্রেন দাবি করে, তারা একরাতেই রাশিয়ার ১১টি জাহাজে সফল আঘাত হেনেছে।

এমনকি দখলকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে যাওয়া স্থলপথগুলোও এখন নিয়মিত ইউক্রেনীয় বাহিনীর আক্রমণের শিকার হচ্ছে। ক্রিমিয়ায় তীব্র খাদ্য ও জ্বালানি সংকট ক্রিমিয়ায় নিয়োজিত রুশ সামরিক বাহিনীর জন্য খাদ্য ও জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মজুত নতুন করে পূরণ করা অত্যন্ত ধীরগতির এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপদ্বীপটির সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর।

আরও পড়ুন রাশিয়ার ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ তেল শোধনাগারে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন ক্রিমিয়ার বাসিন্দারা এখন দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবার মজুত করতে শুরু করেছেন। পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষকে সারা রাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে একটুখানি পেট্রোলের জন্য। তাও আবার সব সময় পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে না।

রাশিয়ার ভেতরে ড্রোন যুদ্ধ ইউক্রেনের এই ড্রোন যুদ্ধ এখন শুধু ক্রিমিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি রাশিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে মূল ভূখণ্ডের অনেক গভীরে আঘাত হানছে। গত জুন মাসে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ১০০টিরও বেশি ড্রোন হামলা নথিভুক্ত করেছে এসিএলইডি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটিই এক মাসে রাশিয়ার ভেতরে সর্বোচ্চ ড্রোন হামলার রেকর্ড।

১৩ জুলাই রুশ কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে তারা প্রায় ৯২৬টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বেশ কিছু ড্রোন রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। ইউক্রেনের নিখুঁত ড্রোন অভিযান রাশিয়ার অভ্যন্তরে যুদ্ধকে একদম নতুন স্তরে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি বিতরণ কেন্দ্রে হামলার কারণে ক্রেমলিনের রপ্তানি আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

একই সঙ্গে, পুরো রাশিয়ায় জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। পাম্পের সামনে রুশদের এমন দীর্ঘ লাইন শেষবার দেখা গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ঠিক আগের দিনগুলোতে। আরও পড়ুন নিজেদের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রুশ সামরিক স্থাপনায় কিয়েভের হামলা ফ্রন্টলাইনে কোণঠাসা রুশ বাহিনী ইউক্রেনের মূল যুদ্ধক্ষেত্রেও রুশ বাহিনী তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। সামরিক হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম রাশিয়া তাদের দখল করা ভূখণ্ড হারাতে শুরু করেছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার থেকে ৬ লাখ ২ হাজার রুশ সেনা নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা যুদ্ধপূর্ব রাশিয়ার যুদ্ধক্ষম পুরুষ জনসংখ্যার প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সিএসআইএস-এর তথ্যমতে, রাশিয়া প্রতি মাসে যেখানে প্রায় ২৭ হাজার নতুন সেনা নিয়োগ দিচ্ছে, সেখানে প্রতি মাসে তাদের হারাতে হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার সেনা। ক্রিমিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ রুট বন্ধ হয়ে গেলে রাশিয়ার জন্য ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/