
পারিবারিক আয়োজন, বিয়ে, উৎসব কিংবা বিভিন্ন পার্টি শিশুদের জন্য আনন্দের সময়। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলা করা কিংবা পরিবারের বাইরের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পায় তারা। তবে এসব আয়োজনেই কখনো কখনো শিশুরা এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা তাদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। অনেক সময় বড়রা শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ করেন, যা তার মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
আবার সন্তান অস্বস্তি প্রকাশ করলেও শুধু অন্যকে খুশি করতে বাবা-মা তাকে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে বলেন। কিন্তু সন্তানের মানসিক ও শারীরিক সীমারেখাকে গুরুত্ব দেওয়া তাকে অভদ্র হতে শেখানো নয়; বরং নিজের অনুভূতি ও নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন করে তোলা। তাই অন্যদের আপনার সন্তানের সঙ্গে নিচের আচরণগুলো করতে দেওয়া উচিত নয়— জোর করে আলিঙ্গন বা চুমু নয় কোনো আত্মীয় বা পরিচিত ব্যক্তি আপনার সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে কিংবা চুমু দিতে চাইতেই পারেন। কিন্তু সন্তান যদি আপনার আড়ালে চলে যায়, সরে যায় বা অনিচ্ছা প্রকাশ করে, তাহলে তাকে জোর করা উচিত নয়।
শিশুর শারীরিক স্নেহ গ্রহণ করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তারও রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তাকে ভদ্রভাবে নিজের অনিচ্ছা প্রকাশ করতে শেখানো যেতে পারে। সন্তানকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য নয় সন্তান শান্ত স্বভাবের হোক কিংবা চঞ্চল—অন্যদের তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেওয়া উচিত নয়। কারণ শিশুরা বারবার নিজের সম্পর্কে কোনো কথা শুনলে একসময় সেটিকেই সত্যি বলে মনে করতে শুরু করতে পারে।
যে শিশু অপরিচিত মানুষের সামনে চুপ থাকে, সে সবসময় লাজুক—এমনটা নয়। আবার কোনো শিশু খেলনা ভাগ করতে না চাইলে তাকে স্বার্থপর বলাও ঠিক নয়। শিশুরা ধীরে ধীরে নিজেদের অনুভূতি বুঝতে ও প্রকাশ করতে শেখে। তাই তাদের আচরণ নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে বড়দের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা নয় পারিবারিক অনুষ্ঠানে শিশুদের তুলনা করার প্রবণতা অনেক সময় দেখা যায়। যেমন—‘ওর মতো ভালো ফল করতে পারো না কেন?’, ‘তোমার কাজিন তো অনেক আত্মবিশ্বাসী’, কিংবা ‘ও ইতোমধ্যে তিনটি ভাষা শিখে ফেলেছে’—এ ধরনের মন্তব্য শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিটি শিশুর বেড়ে ওঠার গতি ও দক্ষতা আলাদা। তাই অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের সন্তানের অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
কেউ তুলনা করলে সহজভাবে বলা যেতে পারে, ‘সে যেভাবে এগোচ্ছে, তাতেই আমরা খুশি।’ এতে সন্তান বুঝতে পারে, অন্য কারও চেয়ে ভালো হওয়ার ওপর তার প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা নির্ভর করে না। সন্তানকে নিয়ে ঠাট্টা নয় অনেক সময় বড়রা শিশুকে নিয়ে করা মন্তব্যকে নিছক মজা হিসেবে দেখেন। কিন্তু শিশুটি যদি চুপ হয়ে যায়, বিব্রত দেখায় কিংবা অস্বস্তি প্রকাশ করে, তাহলে বিষয়টি তার কাছে মোটেও মজার নাও হতে পারে। চেহারা, ওজন, কণ্ঠস্বর, পোশাক, পড়াশোনা, অভ্যাস কিংবা ব্যক্তিত্ব নিয়ে করা ঠাট্টা শিশুর আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি থামিয়ে দেওয়া উচিত। অন্যদের সামনে সন্তানের দুর্বলতা তুলে ধরা নয় সন্তানের ভুল, দুর্বলতা বা ব্যক্তিগত বিষয় অন্যদের সামনে আলোচনা করা থেকে বিরত থাকা ভালো। এতে শিশু বিব্রত হতে পারে এবং বাবা-মায়ের প্রতি তার আস্থাও কমে যেতে পারে। সন্তানের কোনো বিষয়ে পরামর্শ বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সবার সামনে নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে শান্তভাবে তা বলা উচিত।
শিশুর যেমন দিকনির্দেশনা প্রয়োজন, তেমনি তার ব্যক্তিগত মর্যাদাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বড়দের সম্মান করা এবং পারিবারিক সম্পর্কের মূল্য বোঝানো জরুরি। তবে সম্মান দেখানোর অর্থ এই নয় যে নিজের অস্বস্তি, অনিচ্ছা বা সীমারেখা উপেক্ষা করতে হবে। সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে নিজের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন করে তোলাই বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আমার বাঙলা/ রাব্বি