
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী গাণিতিক তত্ত্ব হচ্ছে স্ট্রিং থিওরি, যা মহাবিশ্বের দুটি প্রধান তত্ত্ব—কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং সাধারণ আপেক্ষিকতা—এর মধ্যে এক শক্তিশালী সেতু সৃষ্টি করে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা, যেখান থেকে পদার্থবিজ্ঞানীরা কণার স্তরে শুরু করে মহাবিশ্বের বৃহত্তম গঠন এবং তার কার্যকারিতা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেতে পারেন। স্ট্রিং থিওরি নিয়ে আলাপ-আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেশন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ ব্রায়ান গ্রিন এবং গণিতজ্ঞ এডওয়ার্ড উইটেনের মধ্যে গভীর আলোচনা হয়।
ব্রায়ান গ্রিন ১৯৮৬ সালের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, তখন দিনগুলোতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্ট্রিং থিওরি নিয়ে সন্দিহান ছিল। তবে উইটেন তখন তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ‘৫০ বছর পরেও মানুষ এই থিওরি নিয়ে আলোচনা করবে।’ আসলে উইটেনের এই ভবিষ্যদ্বাণী আজ সত্যে পরিণত হয়েছে, কারণ ৪০ বছর পরেও স্ট্রিং থিওরি বৈজ্ঞানিক চর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।
স্ট্রিং থিওরি এমন এক ধারণা, যেখানে পদার্থের মৌলিক কণাগুলো একটি নির্দিষ্ট বিন্দু নয় বরং অতি ক্ষুদ্র, কম্পনশীল সুতার মতো। এই ধারণার ফলে সৃষ্ট গাণিতিক কাঠামো বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। উইটেনের কাছে স্ট্রিং থিওরির পথচলা কখনও সহজ ছিল না। এর আলোচনা ও গবেষণার সময় বহুবার এটি ভুল বা অসংগত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু অদ্ভুত গাণিতিক সংযোগের মাধ্যমে এটি সব বাধা অতিক্রম করেছে।
১৯৮২ সালের দিকে উইটেন একটি মৌলিক নিয়ম আবিষ্কার করেন, যা তথাকথিত দুর্বল পারমাণবিক বলের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ ছিল। তবে ১৯৮৪ সালে বিজ্ঞানী জন শোয়ার্জ এবং মাইকেল গ্রিন এক নতুন গাণিতিক মডেল প্রবর্তন করেন, যা এই সমস্যার সমাধান দেয়। উইটেন জানালেন, এই আবিষ্কার তাকে স্ট্রিং থিওরির দিকে আরও গভীরভাবে মনোনিবেশ করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল।
আমাদের পরিচিত বিশ্ব তিনটি স্থানিক মাত্রা এবং একটি সময় মাত্রার সমন্বয়ে গঠিত, কিন্তু স্ট্রিং থিওরির কার্যকারিতা প্রমাণিত করতে এবং সমাধান পেতে অতিরিক্ত মাত্রার প্রয়োজন হয়। উইটেনের গবেষণা দেখায় যে, এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো কিভাবে অতি ক্ষুদ্র আকৃতিতে আমাদের চারপাশে লুকিয়ে রয়েছে এবং কিভাবে তা কণার ভর নির্ধারণ করতে সক্ষম। কিন্তু এর ফলে আকারের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, কারণ এগুলোর গাণিতিক আকৃতি শুরুতে মাত্র ৫টি ধরন হলেও পরে কোটি কোটি হয়েছে।
নব্বইয়ের দশকে স্ট্রিং থিওরির জগতে ঘটে এক মহান আবিষ্কার যা দ্বৈততা (ডুয়ালিটি) নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে একই ভৌত বাস্তবতাকে দুইটি ভিন্ন গাণিতিক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হয়। উইটেনের সহকর্মী হুয়ান মালদাসেনা প্রমাণ করেন যে মহাকর্ষহীন কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি আসলে মহাকর্ষযুক্ত একটি উচ্চমাত্রার জগতের সমতুল্য হতে পারে। এই হলোগ্রাফিক তত্ত্ব আমাদের পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করে।
ডুব দিতে গিয়ে, বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানী স্ট্রিং থিওরির পরীক্ষামূলক প্রমাণ খুঁজতে অগ্রসর হচ্ছেন; তবে এখনও কোনো ল্যাবরেটরিতে এর সরাসরি প্রমাণ মেলেনি। তবে ১৯৮৬ সালের পর মহাকাশ বিজ্ঞান ও কসমোলজিতে অসাধারণ অগ্রগতি হয়েছে, যা স্ট্রিং থিওরির গবেষণাকে আলোকিত করার পথে নতুন আলোক দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে লাইগো প্রকল্পের মাধ্যমে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করা হয়েছে, যা আধুনিক কসমোলজির একটি বড় দৃষ্টান্ত।
উইটেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বৈজ্ঞানিক গবেষণা মূলত ধৈর্যের পরীক্ষা। বহু সময় একটি লাইনেরও লেখা হয় না, কিন্তু সেই নিশ্চল মুহূর্তের মাঝে ধারাবাহিক চিন্তা-ভাবনার ফলে কখনও কখনও জন্ম নেয় চমকপ্রদ ও যুগান্তকারী ভাবনা।এই আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞান শুধুমাত্র ল্যাবরেটরির পরীক্ষামূলক নীরস কাজ নয় বরং এটি পরম সত্যের অনুসন্ধানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্ট্রিং থিওরি হয়তো এখনো পরিপূর্ণভাবে প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু এই তত্ত্ব আমাদের বিশ্ব বোধের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি উপহাস দিয়েছে, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরকালীন এক মূল্যবান অধ্যায় হয়ে থাকবে।