
‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানেশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্প, যা ইআরএল-২ নামে পরিচিত, অবশেষে আলোর আলো দেখতে পেয়েছে। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) এই প্রকল্পের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণের মঞ্জুরি দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এর উদ্যোগে এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং পরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাবে। সরকারের অধীনে ২০২৫ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের ব্যয় ৩১ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে, যা ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চলবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, প্রকল্পটি আগে বৈদেশিক ঋণের সংস্থান ছাড়াই অনুমোদন পেয়েছিল। এখন নতুন করে আইডিবি প্রকল্পটির জন্য ১.০৪ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা) ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ঋণের অনুমোদন দিয়েছেন এবং ৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে চুক্তিটি সম্পন্ন হবে। এই ঋণ দুটি কিস্তিতে আসবে। প্রথম কিস্তি ৫২০.৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং দ্বিতীয় কিস্তি ৪৮৩.১০ মিলিয়ন ডলার।
এই ঋণ সুদগ্রহণ শুরু হবে স্বাধীন শরিয়াহ-সম্মত ‘ফরওয়ার্ড লিজ’ মডেলের মাধ্যমে। ঋণের শর্তাবলি কঠোর, অর্থবহ শর্ত প্রয়োগ করা হয়েছে, যার মধ্যে আছে বাজারভিত্তিক ভাসমান মূল্য নির্ধারণ ও ছয় মাসের সময়সীমার মধ্যে চুক্তির কার্যকরণ। ঋণের পরিশোধের সময়সীমা হবে ১৫ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। এছাড়া নির্মাণকালীন প্রতি ছয় মাস অন্তর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে এবং যদি সময়সীমা পালনে ব্যর্থ হয় তবে অর্থায়ন বাতিলের ঝুঁকি রয়েছে।
ঋণদাতা সংস্থা এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনে তা বাংলাদেশকে ইজারা দেবে। ঋণের অর্থ সম্পূর্ণ পরিশোধের পর ‘রেন্ট-টু-ওন’ চুক্তির আওতায় যন্ত্রপাতির মালিকানা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। অর্থাৎ আমরা এক্ষেত্রে ভাড়ায় ব্যবহার করবো এবং ভবিষ্যতে মালিকানা আমাদের হবে। ২০ বছরের এই প্যাকেজে নির্মাণকালীন গ্রেস পিরিয়ড থাকলেও ব্যয়ের পরিমাণ আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
ইআরএল-২ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন।
১০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল। একাধিক সংশোধনির মাধ্যমে গত বছর প্রকল্পের ব্যয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন সরকারের অধীনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার ফলে প্রকল্পটি নতুন প্রাণ ফিরে পেল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে, ইআরএলের ক্রুড অয়েল পরিশোধন ক্ষমতা বাড়িয়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে, যা মোট চাহিদার ৬২-৬৫ শতাংশ মেটানোর সম্ভবনা তৈরি করবে।
নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েল কেনার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয় সম্ভব হবে। বর্তমান সরকারের উদ্যোগে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এরূপ কার্যকরী পদক্ষেপ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ণে উচ্চমানের বাণিজ্যিক পণ্য যেমন এলপিজি, গ্যাসোলিন, ডিজেল এবং অন্যান্য কাঁচামালের ঘাটতি কমাবে।
তবে, প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়োপযোগীভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিপিসিকে প্রয়োজনীয় কাজ সহানুভূতি সহকারে সম্পন্ন করতে হবে। প্রকল্পটিকে সময়মতো বাস্তবায়ন করা হলে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।