দেশে চিকিৎসা খাতে অক্সিজেনের চাহিদা ক্রমেই বাড়লেও প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হয়নি। কোভিড-১৯

অক্সিজেন সংকট: চিকিৎসা খাতে জরুরি বিনিয়োগের আহ্বান

দেশে চিকিৎসা খাতে অক্সিজেনের চাহিদা ক্রমেই বাড়লেও প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হয়নি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তৈরি করা অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার বড় একটি অংশও বর্তমানে অচল হয়ে পড়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে (আইইউবি) আয়োজিত এক নীতি-সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

‘ফ্রম অ্যাভিডেন্স টু অ্যাকশন: স্ট্রেংদেনিং ইকুইটেবল অ্যাকসেস টু মেডিকেল অক্সিজেন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংলাপটি আইইউবির মাল্টিপারপাস হলে অনুষ্ঠিত হয়। আইইউবির স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথের সহযোগিতায় সেন্টার ফর হেলথ, ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পলিসি সায়েন্সেস (চিপস) এ সংলাপের আয়োজন করে। আলোচনায় বক্তারা বলেন, মহামারির সময় স্থাপন করা অক্সিজেন প্ল্যান্ট ও সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশ বর্তমানে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা।

বিশেষ করে প্রসূতি, স্ত্রীরোগ ও শিশু রোগীদের চিকিৎসায় নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংলাপে সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়। বক্তারা এমবিবিএস ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের চিকিৎসা শিক্ষায় অক্সিজেন থেরাপি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। বিদ্যুৎ-সংযোগ নেই এমন প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচলিত অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সেখানে সৌরশক্তিচালিত অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ব্যবহারের পরামর্শ দেন বক্তারা।

তাদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি মৃত্যুহার কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সোমালিয়ায় ইতোমধ্যে সৌরশক্তিচালিত অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহারের উদাহরণও তুলে ধরা হয়। আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিমের সভাপতিত্বে সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম। বিশেষ সম্মানিত অতিথি ছিলেন রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী।

বিশেষ অতিথি ছিলেন আইইউবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান দিদার এ হোসেইন। প্রধান অতিথি অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম বলেন, অক্সিজেনের সমতাভিত্তিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে কী ধরনের ভূমিকা প্রয়োজন, সংলাপে অংশ নিয়ে সে বিষয়ে তিনি আরও স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন। গবেষণালব্ধ তথ্যকে নীতিনির্ধারণী উদ্যোগে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি বলেন, অচল হয়ে পড়া অক্সিজেন সরবরাহ অবকাঠামো মেরামতের পাশাপাশি স্থানীয় জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়াও জরুরি।

এতে স্বাস্থ্যকর্মীরা কোন রোগীর অক্সিজেনের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি এবং কীভাবে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন। স্বল্পমূল্যে মানসম্মত অক্সিজেন থেরাপি নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বলেন, সরকারের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নীতিতে অক্সিজেনকে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই অক্সিজেনের মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এর সরবরাহ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারি খাত, জনহিতৈষী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে অক্সিজেন উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করতে ঝিনাইদহে আইইউবি ও তার প্রতিষ্ঠান জাহেদী ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি সমীক্ষা পরিচালনার কথাও জানান তিনি। চিপসের পরিচালক ডা. এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, সংলাপে উঠে আসা বিষয়গুলো সমন্বয় করে একটি নীতিপত্র তৈরি করা হবে। এতে দেশে অক্সিজেনের সমতাভিত্তিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকবে এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে বিভিন্ন খাতের অংশীজনদের সম্পৃক্ত করতে আইসিডিডিআর, বি ও অক্সিজেন নেটওয়ার্কের সহযোগিতায় আগামী অক্টোবরে একটি অক্সিজেন সামিট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে আইইউবির। সংলাপে ‘রিডিউসিং গ্লোবাল ইনইকুইটিজ ইন মেডিকেল অক্সিজেন অ্যাকসেস: দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর, বি-এর বিজ্ঞানী ডা. এহসানুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকার বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের শিশু ও নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আবিদ হোসেন মোল্লা, আইসিডিডিআর, বি-এর মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের ইমেরিটাস বিজ্ঞানী ডা. শামস এল আরেফিন, চিকিৎসক ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. মামুনুর রহমান মালিক এবং প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল। সংলাপে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি), ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন, অবসটেট্রিক অ্যান্ড গাইনোকোলজী সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ইউএনওপিএস ও ইউএনডিপির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এ ছাড়া আইইউবির স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ট্রাস্টি রাশেদ চৌধুরী ও ড. হোসনে আরা আলী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন স্কুল অব ফার্মেসি অ্যান্ড পাবলিক হেলথের ডিন ডা. কামরান উল বাছেত। সেন্টার ফর হেলথ, ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পলিসি সায়েন্সেস (চিপস) প্রমাণভিত্তিক জনস্বাস্থ্য অ্যাডভোকেসি, ইমপ্লিমেন্টেশন গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্ল্যাটফর্ম। প্রতিষ্ঠানটি নীতি গবেষণা ও সহায়তা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইমপ্লিমেন্টেশন গবেষণা এবং নলেজ ম্যানেজমেন্ট—এই চারটি ক্ষেত্রে কাজ করে।

মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ, কিশোর-কিশোরী ও মানসিক স্বাস্থ্য, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অক্সিজেন সরবরাহ এবং নগর ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। আমার বাঙলা/ রাব্বি


Comment As:

Comment (0)