ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সাধারণত ক্যালরি কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ইচ্ছাশক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শুধু ডায়েট নয়, ওজন কমানোর পেছনে রয়েছে পাচনতন্ত্র ও বিপাকক্রিয়ার বড় ভূমিকা
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সাধারণত ক্যালরি কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ইচ্ছাশক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, শুধু খাবারের পরিমাণ কমালেই সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। একই খাবার খাওয়া ও একই পরিমাণ ব্যায়াম করার পরও দুই ব্যক্তির ওজন কমানোর ফল ভিন্ন হতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো শরীরের পরিপাকতন্ত্র বা পাচনতন্ত্রের কার্যকারিতা।
পাচনতন্ত্র শুধু খাবার হজমের কাজ করে না; এটি মস্তিষ্ক, লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে। ক্ষুধা, পেট ভরা অনুভূতি, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শরীরে চর্বি জমা এবং শক্তি ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে এর বড় ভূমিকা রয়েছে। পাচনতন্ত্রের এই ভারসাম্য নষ্ট হলে বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমতে শুরু করে। পাচনতন্ত্র: শরীরের বিপাক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মানুষের অন্ত্রে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও বিভিন্ন অণুজীব বাস করে, যাদের একসঙ্গে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বলা হয়।
এসব অণুজীব খাবার হজমে সহায়তা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টি তৈরি করে এবং শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য স্বাভাবিক ওজনের মানুষের তুলনায় কম হতে পারে। কিছু অণুজীব একই খাবার থেকে শরীরকে বেশি ক্যালরি গ্রহণে সহায়তা করে, ফলে অতিরিক্ত খাবার না খেলেও শরীরে বেশি শক্তি জমা হতে পারে। অন্যদিকে, উপকারী ব্যাকটেরিয়া আঁশযুক্ত খাবার থেকে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা লিভারের কার্যকারিতা ও ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
অন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে। ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণে অন্ত্রের ভূমিকা আমাদের ক্ষুধা ও পেট ভরা অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন হরমোন কাজ করে, যার বড় অংশই তৈরি হয় পরিপাকতন্ত্রে। খাবার খাওয়ার পর জিএলপি-১ এবং পেপটাইড ওয়াইওয়াই নামের হরমোন মস্তিষ্ককে পেট ভরে যাওয়ার সংকেত দেয়। অন্যদিকে, ঘ্রেলিন নামের হরমোন খাবারের আগে ক্ষুধার অনুভূতি তৈরি করে।
অন্ত্রের সুস্থ ব্যাকটেরিয়া এই হরমোনগুলোর সঠিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয়, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট এবং কম আঁশযুক্ত খাবার খেলে এই সংকেত ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর ফলে বারবার ক্ষুধা লাগা এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। রক্তের শর্করা ও পেটের চর্বির সম্পর্ক অন্ত্রের স্বাস্থ্য শুধু ওজন নয়, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্ত্রের দেয়াল দুর্বল হয়ে গেলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কিছু উপাদান রক্তে প্রবেশ করে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের প্রদাহ চলতে থাকলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায় এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন পেটের স্থূলতায় ভুগছেন এবং প্রতি চারজনের একজন সাধারণ স্থূলতায় আক্রান্ত। শরীরের সব চর্বি সমান ক্ষতিকর নয়।
ত্বকের নিচে জমা চর্বির তুলনায় পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে থাকা ভিসারাল ফ্যাট বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই চর্বি বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি করে, যা ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও চিকিৎসার ভূমিকা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম এবং গাঁজানো খাবার যেমন দই খাওয়া উপকারী। এসব খাবার অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণেও মাইক্রোবায়োম সুস্থ থাকে। তবে দীর্ঘদিনের স্থূলতা, যেখানে নিয়মিত চেষ্টা করেও ওজন কমানো সম্ভব হয় না, সেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেরিয়াট্রিক সার্জারিকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্লিভ গ্যাস্ট্রেক্টোমি বা গ্যাস্ট্রিক বাইপাসের মতো অস্ত্রোপচার শুধু পাকস্থলীর আকার কমায় না, বরং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ও বিপাকীয় ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই শুধু না খেয়ে থাকা বা কঠোর ডায়েট অনুসরণ করলেই দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
শরীর কীভাবে খাবার গ্রহণ করে, ব্যবহার করে এবং শক্তিতে রূপান্তর করে—তার পেছনে পাচনতন্ত্র, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ও হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে অন্ত্রকে সুস্থ রাখা সম্ভব। আর একটি সুস্থ পাচনতন্ত্রই হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ভালো বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ভিত্তি। আমার বাঙলা/ তালহা





