তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ছয় মাস পার করেছে। দীর্ঘ গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং চব্বিশের গণ-অভ্

১৮০ দিনে পরিবর্তনের সূচনা: অর্থনীতি, কূটনীতি ও জনকল্যাণে নতুন উদ্যোগ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ছয় মাস পার করেছে। দীর্ঘ গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন, জনগণের প্রত্যাশার চাপ, নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, রাজনৈতিক সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এই সরকারের কাঁধে।

ফ্যাসিস্ট রেজিমের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা থেকে উত্তরণ, একটি গতিশীল ও দেশের স্বার্থে সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশকে সমৃদ্ধির মহাসড়কে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার কাজ করছে।

গত ছয় মাসে সরকারের যেমন সংকট ছিল, তেমনি ছিল নানা চ্যালেঞ্জ। তবে সরকার তার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

সংকট পেরিয়ে অগ্রযাত্রা

সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিসংকট সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশই এই সময়ে তাদের স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এমনকি অনেক দেশে তা প্রায় ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যদিও বাংলাদেশে দাম বেড়েছে ১০ শতাংশের কাছাকাছি।

সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিজস্ব জ্বালানি উৎসের সন্ধানের দিকেও মনোযোগ দিয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যা মোট চাহিদার ২০ শতাংশ। ইতিমধ্যে জাতীয় রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিং কর্মসূচির আওতায় প্রথম ১৮০ দিনে ২০০ মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক-সহায়িত প্রকল্পে জাতীয় গ্রিডে আরও ৩৩৮ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে, যা বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৭৭ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমাবে।

শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অগ্রাধিকার

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। আগের বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। বর্তমানে শিক্ষায় বরাদ্দ দেশের জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে।

কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে সারা দেশে নতুন টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ নির্মাণ প্রকল্পের বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে।

১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদান অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন। দীর্ঘ চার বছর ধরে জমে থাকা শিক্ষকদের বকেয়ার জট কাটাতে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে শিক্ষকদের নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এই অর্থ পাঠানো হচ্ছে।

দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই বিনা মূল্যে স্কুলড্রেস ও স্কুলব্যাগ বিতরণ করা হবে।

নারীশিক্ষার প্রসার ও সামাজিক বৈষম্য নিরসনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম কিস্তিতে ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৫৭৯ জন এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে ৬৬ লাখ ৭০ হাজার ২৭৩ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মোবাইল অ্যাকাউন্টে মোট ১ হাজার ১৮১ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাত

চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশের সব ৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতাল পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সারা দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী।

ধর্মীয় নেতাদের কল্যাণ ও আর্থিক নিরাপত্তা

মসজিদ ও মন্দিরের ধর্মীয় নেতাদের জন্য রাষ্ট্রের অর্থায়নে মাসিক সম্মানী ও কল্যাণ ভাতা চালু করা হয়েছে। ধর্মীয় প্রধানদের সম্মানী প্রকল্পের পাইলটিং পর্যায়ে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবায়েত, বৌদ্ধ অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষসহ সর্বমোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে ভাতা দেওয়া হয়েছে।

সম্মানীর আওতা সম্প্রসারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ধর্মীয় নেতা ও সেবাকর্মীকে রাষ্ট্রীয় সম্মানীর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির জন্য বাজেটে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রবাসী কার্ড

প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা, আইনি সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় চলতি আগস্ট মাস থেকে বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’ পরীক্ষামূলকভাবে চালু হতে যাচ্ছে।

এ ছাড়া বিদেশগামী নাগরিকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা ও ভাষা শিক্ষার জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে দেশে প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে অর্থবহ আলোচনা চলছে।

এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের সুফল ইতিমধ্যে জনগণ পাচ্ছে।

কূটনৈতিক সাফল্য

এই সরকারের অন্যতম সাফল্য হলো ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক ও নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি সাজানো। এর ফলে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও সম্মাননা পান। মালয়েশিয়ার সরকারও আন্তরিকতার সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারে সম্মত হয়েছে। এই সফর শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। ইতিমধ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি চীন সফরে বাণিজ্য, অবকাঠামো, কৌশলগত সহযোগিতা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চীনের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে অর্থবহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, তুরস্ক, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সফর পাইপলাইনে রয়েছে, যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে বৈশ্বিকভাবে আরও শক্তিশালী করছে।

বৈদেশিক বিনিয়োগ

২০২৫ সালে বাংলাদেশে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২৩ কোটি ডলার। বাংলাদেশে এফডিআইয়ের মোট মজুত (FDI Stock) বেড়ে ১ হাজার ৯৬৩ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের ১ হাজার ৭৮৬ কোটি ডলারের তুলনায় বেশি।

বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত, বাংলাদেশ ইউএস চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। সেখানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সৌদি আরব ও দক্ষিণ কোরিয়াও বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) স্বাক্ষরের উদ্যোগ এগিয়ে চলছে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে উঠছে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল’, যেখানে এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। চট্টগ্রামের মিরসরাই শিল্পাঞ্চলে জাপানি বিভিন্ন কোম্পানি ও অন্যান্য বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পুরোদমে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বিডায় সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ দুটিই বাঁচছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ছে।

এটা সত্য যে ছয় মাসে কোনো সরকারের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত বিচার করা কঠিন। তবে এই সময়টুকুতে একটি সরকারের অগ্রাধিকার, নীতির দিকনির্দেশনা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার বার্তা মেলে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের এই সময়ে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক জটিলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার মতো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

এই বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং মানুষের জমে থাকা প্রত্যাশার ভার একসঙ্গে মোকাবিলা করা সহজ কাজ নয়। তবে ১৮০ দিনে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেখানে সবার সহযোগিতা নিয়ে এই সরকার তার মেয়াদের শেষ নাগাদ আরও শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে।

মতামত লেখকের নিজস্ব


Comment As:

Comment (0)