রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকটের ফলে বাসিন্দারা নানা সমস্যায় পড়েছেন। গ্যাসের অভাবে
রাজধানীতে গ্যাস সংকটের ফলে বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি
রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় আজমল হোসাইন তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। গত আড়াই মাস ধরে তার বাসায় গ্যাস আসছে না। প্রাথমিকভাবে আজমল ও তার পরিবার বাইরে থেকে খাবার সংগ্রহ করে খেয়েছেন, কিন্তু এখন রান্না করার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে বাধ্য হয়েছেন। আজমল বলেন, "চুলার দাম পড়েছে সাত হাজার টাকা। বৈদ্যুতিক চালনা হিসেবে বিলও বেড়ে গিয়েছে; আগে ১৫০০ টাকা বিল আসত, এখন ২৮০০ টাকা।" গ্যাস সংকটের কারণে নিরাপদ পানির অভাবও দেখা দিয়েছে। রান্নার জন্য পানি ফুটানোর সামর্থ না থাকায় তিনি আতঙ্কিত। তার দুই সন্তান, আরসালান (২) ও আহসান (৯), অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, "পানির এটিএম বুথ থেকে সংগ্রহ করি, কিন্তু এটি কতটা বিশুদ্ধ, তা সন্দেহের মধ্যে। প্রথমবার যখন খাই, পুরো পরিবার ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়েছিল।"
মিরপুরের হাজি মার্কেট এলাকার গৃহিণী আয়েশা সিদ্দিকা জানান, তিনি চার মাস ধরে গ্যাসের সংকটে ভুগছেন। সম্প্রতি রাতে কিছুটা গ্যাস এলেও এখন আবার একদমই গ্যাস নেই। বিকল্প হিসেবে গ্যাসের সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। আয়েশা বলেন, "বিদ্যুতের বিল তো বেড়েছে, তার ওপর বৈদ্যুতিক চুলার জন্য বাড়তি বিল আসে। আগে ১ হাজার টাকা বিল আসত, এখন ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে আসছে।"
ভারতীয় উপমহাদেশে গ্যাসের উৎপাদন গত ৯ বছর ধরে কমতে থাকায় এলএনজি আমদানির চেষ্টা শুরু হয়েছে ২০১৮ সাল থেকে। মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। গ্যাসের তীব্র সংকট কাটাতে ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে চালু হয় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হয়। তবে এলএনজির নতুন কার্গো আসার অভাবে এক্সিলারেটের সরবরাহ ১৯ আগস্ট বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে একটি নতুন এলএনজির কার্গো এসে পৌঁছালে কিছু পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। কিন্তু বর্তমানে সংকট কাটছে না।
পূর্ব শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা শান্তা রানী জানিয়েছেন, তার রান্নাঘরের বাইরের কিছু পোড়া ইট দিয়ে রান্নার জন্য একটি চুলা বানিয়েছেন। বলেন, "গ্যাস কয়েক দিন একেবারেই আসেনি। কাল থেকে কিছুটা এল। দুপুর ২টা নাগাদ সামান্য গ্যাস এলে রান্না শুরু করি। সকাল বেলা খাবার করা যায় না। আমাদের দুপুরের খাবার খেতে খেতে তিনটা চারটাও বাজে।"
রাজধানীর কালশীর শিল্পী খাতুনের অবস্থা আরও ভোগান্তির। টিনশেড একটি বাড়িতে একাধিক পরিবার একসঙ্গে থাকেন এবং পালা করে রান্না করতে বাধ্য হন। তিনি জানান, বাড়িওয়ালা বৈদ্যুতিক চুলা ও লাকড়ি ব্যবহার করতে দেন না। শিল্পীর স্বামী রিকশা চালান, ফলে কখনো কখনো খাবার কিনতে খরচ নিয়েও টেনশনে থাকেন। শিল্পী জানান, "রান্না না হলে বাইরে খেতে হয়; তখন দুই আড়াইশ টাকা চলে যায়।"
মিরপুরের একটি ব্যাচেলর বাসায় বসবাসকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শিহাব জানান, তার কাছে গ্যাস সংকট প্রায় দেড় মাস ধরে চলছে। রান্না না হওয়ায় মাসিক খরচ বেড়ে গেছে। বলেন, "গ্যাসের সমস্যা থেকে যায়, কিন্তু প্রতি মাসে গ্যাস বিল দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। এর ফলে গ্যাসট্রিকের সমস্যা বাড়িয়ে দিয়েছে।"
অন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাবরী হাসান জানান, সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং সরকারি গ্যাসের জন্য আগে ৮০০-১০০০ টাকা দিতে হতো, এখন সিলিন্ডারের জন্য টাই আশা প্রায় ৭০০-৮০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এতে তাদের ওপর খরচের চাপ অনেকটা বেড়ে গেছে।
জাতীয় এই সমস্যা নিয়ে গ্যাসের সংকট নিরসনে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। গ্যাস সংকট কাটাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান তারা।





